বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম ‘মুনলাই পাড়া’

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য জেলা বান্দরবান। এই জেলারই একটি গ্রামের নাম মুনলাই পাড়া, যেখানে দেখা যায় উঁচুনিচু পাহাড়ি টিলা আর নীল আকাশে সাদা মেঘের খেলা। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন গ্রাম এই মুনলাই পাড়া। রুমা উপজেলায় অবস্থিত মুনলাই পাড়াকে দেশের সুন্দরতম গ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পাহাড় নদী আর হ্রদে ঘেরা এই ছিমছাম গ্রামে গেলে মনে হবে না এটি বাংলাদেশের কোনো জায়গা। নৈসর্গিক মাধুর্যে পর্যটকরা মুহূর্তেই হারিয়ে যেতে পারেন কোনো এক কল্পনার রাজ্যে।

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রুমা উপজেলার সদর ইউনিয়নের মুনলাই পাড়া গ্রামের অন্যতম আকর্ষণ হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। এখানকার রাস্তাঘাট কিংবা বাড়ির আঙিনা কোথাও কোনো ময়লা আবর্জনা পাওয়া যায় না। ছোট ছোট টিলার ওপরে গড়ে উঠেছে বম সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি। এ পাড়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে মোট ৫৪টি পরিবার বসবাস করে। বম সম্প্রদায়ের বাড়িগুলো কাঠের তৈরি। বাড়িগুলোতে বিলাসিতার চিহ্ন নেই, তবে ঘরের ভেতরে ও বাইরে পরিপাটি করে সাজানো। বাড়িগুলোর চারদিকে কেবলই সবুজের হাতছানি এবং বারান্দায় শোভা পায় অর্কিডসহ নানান জাতের ফুলের গাছ। বম জাতিরা যেমন পরিচ্ছন্ন তেমনি বাড়ির চারপাশকে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি করে রাখে। তারা একতা এবং সংঘবদ্ধতায় বিশ্বাসী। সে কারণেই তারা মিলেমিশে গ্রামটির পরিবেশ নির্মল রাখার চেষ্টা করে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তাদের পাড়ায় রোজ দশ মিনিট করে ঘরের চারপাশ ও রাস্তা পরিষ্কার করা এই গ্রামের বাসিন্দাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। এমনকি সম্মিলিতভাবে নিয়মিত এই গ্রামের ডাস্টবিনগুলো পরিষ্কার করে গ্রামবাসীরা। তাই সেখান থেকে ছড়ায় না কোনো প্রকার দুর্গন্ধ। সমষ্টিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ। গড়ে তোলা হয়েছে মুনলাই পাড়া কমিউনিটি ট্যুরিজম দ্য ম্যানেজমেন্ট কমিটি। তাই মুনলাই পাড়া কেবল সুন্দরই নয়, দেশের অন্যতম সুন্দর পরিচ্ছন্ন গ্রামের তকমাও পেয়েছে। মুনলাই গ্রামটি আর দশটি পাহাড়ি জনপদ থেকে আলাদা করে তুলেছে আরেকটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য।
৩০ বছর আগে রুমা উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে বম সম্প্রদায়ের কিছুসংখ্যক মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নেন। তারা গড়ে তোলেন ছোট এই পাড়া। আর এ পাড়াটির নাম রাখা হয় মুনলাই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় শুরু থেকেই সাজানো গোছানো ছিল এ পাড়াটি। পরে বেসক্যাম্প বাংলাদেশ নামে একটি পর্যটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নেয় এখানে কমিউনিটি বেজ পর্যটনের। নেওয়া হয় ‘মুনলাই কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম’ নামের উদ্যোগ। এই ট্যুরিজমের অধীনে এখানকার কয়েকটি বাড়িতে রয়েছে পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা। পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয়দের মনোমুগ্ধকর ঐতিহ্যবাহী বাঁশনৃত্য উপভোগের আয়োজন। এর পাশাপাশি ট্রেকিং, ৫৫০ ফুট দীর্ঘ জিপলাইন, নদী ও খালে কায়াকিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে এ পাড়াটিতে।
এই মুনলাই কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজমে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বান্দরবান জেলা সদর থেকে মাত্র দুই ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় এ চমৎকার স্থানটিতে। রুমা উপজেলা সদর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিলে দেখা মিলবে দেশের সুন্দরতম এই গ্রামটির। জেলা শহর থেকে চাঁদের গাড়ি নিয়ে সকালে রওনা দিলে দুপুরের মধ্যে এই মুনলাই পাড়ায় পৌঁছানো যায়। মেঘেঢাকা পাহাড়ি প্রকৃতি সাঙ্গু নদী আর রহস্যময় বগা লেকের সৌন্দর্য ছাড়াও পাহাড়ি ঢিলায় স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘর। এখানকার পাহাড়ি ইকো কটেজগুলোতে থাকতে পারলে পাহাড়ি রান্নার স্বাদ ও মিলে যায়। পর্যটকরা চাইলে রাতের বেলায় বারবিকিউ বা ক্যাম্পায়ারের আয়োজনও করতে পারেন। দুই থেকে তিন দিনের খাওয়া-দাওয়া ও হোটেল ভাড়া মিলে খরচ হতে পারে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। বান্দরবান থেকে যাওয়া আসা জনপ্রতি আরও খরচ হতে পারে হাজার চারেক টাকা।
মুনলাই পাড়া কমিটির সভাপতি ডেবিট বম জানিয়েছেন, এই গ্রামের বাসিন্দারা কখনোই তাদের বাড়ির দরজায় তালা দেয় না। কারণ চুরি হওয়া কী জিনিস তারা তা জানেই না। যে কেউ যখন তখন ঘর খোলা রেখে বাড়ির বাইরে চলে যায় কিন্তু ঘর থেকে কোনো জিনিস চুরি হয় না। এমনকি রাতের বেলাতেও এই গ্রামটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বম সম্প্রদায়ের কেউ যখন ঘর খোলা রেখে যান তখন প্রতিবেশীরা সে ঘর পাহারা দিয়ে রাখে। কারণ এ সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরকে নিজের পরিবারের অংশ মনে করে।

