শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৩২ পূর্বাহ্ন

সাতকানিয়ায় সাবেক চেয়ারম্যানকে ঘরে ঢুকে নৃশংসভাবে হত্যা

শহীদুল ইসলাম বাবর
  • প্রকাশ : সোমবার, ১ মার্চ, ২০২১
  • ৯০১
নগদ টাকা,স্বর্ণালংকার লুট:মালামাল তছনছ
@ ঘটনাস্থল পরির্দশন করলেন এসপি
দক্ষিণ চট্টগ্রমের সাতকানিয়ায় এক প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুল হক মিঞা (৯০) ঘরে ঢুকে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার সকালে উপজেলার কেওচিয়া ইউনিয়নের জনার কেঁওচিয়া চেয়ারম্যান পাড়াস্থ নিজ বাড়ি থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে রাতের যে কোন সময়ে কে বা কারা ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করে। একই সময় বাড়িতে থাকা একমাত্র কর্মচারী জমির উদ্দিন (৩০)কে হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয় বলে জানা গেছে। সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন খুনের ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক, সাতকানিয়া সর্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকারিয়া রহমান জিকু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পুলিশ তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে খুনের ঘটনায় কারা জড়িত থাকতে পারে এমন ধারনা দিতে না পারলেও সুষ্ট তদন্তপূর্বক এ ঘটনায় কারা জড়িত তা বের করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবী জানিয়েছেন আব্দুল হক মিঞার ছেলে মাঈনুদ্দিন। ইতিমধ্যে পুলিশ এ ঘটনায় গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত বাঁশখালী উপজেলার জলদি এলাকার হাবিবুর রহমানের পুত্র জমির উদ্দিন (২৮)। হ্নীলার বাসিন্দা নুর উদ্দিন (৫০) ও নুর নাহার (৫২ ) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেঁওচিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সহ-সভাপতি আব্দুল আব্দুল হক মিঞার সন্তানেরা কেরানীহাট এলাকায় বিভিন্ন ব্যবসাার সাথে সম্পৃক্ত হলেও ছোট ছেলে ব্যাতিরেখে অন্যান্য সন্তানেরা পরিবার নিয়ে চট্রগাম শহরে বসবাস করেন। ঘটনার দিন ছোট ছেলের স্ত্রী সন্তানেরাও বাড়িতে ছিলনা। বাড়িতে শুধু মাত্র গৃহকর্মী জমির আর আব্দুল হক মিঞা অবস্থান করছিল। সকাল আনুমানিক ৯টার সময় প্রতিদিনকার ন্যায় স্থানীয় নুর নাহার বেগমত কাজ করতে আসলে বাড়ির প্রধান ফটক ভেতর থেকে বন্ধ দেখেন। অনেক ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলায় পেছনের দরজাতে গিয়ে দরজা খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকে গৃহকর্মী জমিরের হাত-পা বাঁধা ও আব্দুল হক চেয়ারম্যানের লাশ খাটের উপরে পড়ে থাকতে দেখে দ্রুত স্থানীয় লোকজনকে ঘটনা জানালে লোকজনের ভীড় জমে যায়। পরে খবর পেয়ে থানা পুলিশের অফিসর ইনচার্জ আনোয়াার হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। অকোস্থলে আসে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক ও সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকারিয়া রহমান জিকু। সকালে কাজ করতে আসা গৃহকর্মী নুর নাহার বেগম সাংবাদিক বলেন, আমি প্রতিদিনকার ন্যায় কাজ করতে এসে সমনের দরজা বন্ধ দেখি। অনেক ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলার কারনে পিছনের দরজাতে গিয়ে দরজাটি খোলা রয়েছে। ভেতরে গিয়ে দেখি জমিরের হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। আর  চেয়ারম্যান সাহেবের লাশ তার খাটে পড়ে আছে। পরে লোকজনকে খবর দিলে তারা এসে জমিরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় আর পুলিশকে খবর দেয়।
কি লুট করলো হত্যাকারীরা ?
আব্দুল হক মিঞাকে নৃশংসভাবে হত্যাকান্ডের বিষয়ে নানা বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন দিক সামনে রেখে তদন্ত করছে পুলিশ। তবে এ বিষয়ে নিহতের ছেলে ব্যবসায়ী মাঈনুদ্দিন বলেন, আমার বাবার কাছে নগদ থাকা প্রায় ৩ লক্ষ টাকা, ১৫ ভরির মত স্বর্ণালংকার হরণ নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।আমার বাবার কাছে রক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ দলিল দস্তাবেদ হরণ হয়েছে কিনা তা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। হত্যাকারীা কি কি নিয়ে গেছে তা পরে জানা যাবে।
এলাকায় শোকের ছায়া-
সাতকানিয়ার প্রবীণ রাজনীতিবীদ ও ধর্ণাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল হক মিঞা হত্যাকান্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকাতুর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা ছাড়াও দুর-দুরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ আব্দুল হক মিঞার লাশ এক নজর দেখতে ভীড় করেন তার বাড়িতে। এসময় মানুষের ভীড় সামলাতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। জানা যায়, বেলা ১১ টা পর্যন্ত সময়ে নিজ পরিবারের কোন সদস্য উপস্থিত না থাকলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই শোকে কাতর হয়ে পড়েন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসলে শুরু হয় কান্নার রোল। বড় ছেলে নেজাম উদ্দিন সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতি, কেরানীহাট ল্যান্ড ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বরত। আর আব্দুল হক মিয়া ছিলেন, কেরানীহাট জামেউল উলুম ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসার সহ-সভাপতি, জনার কেঁওচিয়া নানু পুকুর শাহি জামে মসজিদ, এডভোকেট কাছিম আলী ফাউন্ডেশন, কেরানীহাট-বান্দরবান-চট্টগ্রাম বাস,কোষ্টার ও পূর্বাণী মালিক সমিতির সভাপতি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সথে সম্পৃক্ত এই প্রবীন রাজনীতিবীদকে হারিয়ে পুরো কেঁওচিয়ায় চলছে শোকের মাতম।
কি কারনে হত্যাকান্ড?
শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া এই প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতাকে কেন হত্যা করা হলো এটি নিয়ে সু-নির্দিষ্ট কারন এখনো পর্যন্ত সনাক্ত না হলেও বেশ কয়েকটি কারনকে সমনে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কারন গুলি হচ্ছে,  বাড়ির ভেতরে থাকা গৃহকর্মীর সম্পৃক্ততা, মালামাল লুটের জন্য দুর্বৃত্তদের হানা ও সম্পত্তির বিরোধ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া জমির উদ্দিন দীর্ঘ দিনের কর্মচারী। বাড়িতে আব্দুল হক চেয়ারম্যান ছাড়া বাড়িতে থাকা একমাত্র ব্যাক্তি হচ্ছে এই জমির। বাড়ির কোন দরজা ভাঙ্গা হয়নি। পিছনের দরজা আর উপরের সিঁড়ি ঘরের দরজাটি খোলা ছিল। খুনিরা কিভাবে বাড়িতে প্রবশে করলো? কে তাদের দরজা খোলে দিল, নাকি আগে থেকেই দরজা খোলা ছিল, খুনিদের দলে কয়জনই বা ছিল এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মাঝে। হত্যাকান্ডের কারন হিসেবে বিভিন্ন দিক সামনে নিয়ে তদন্ত কাজ শুরু করলেও খুব কম সময়ের মধ্যে হত্যাকান্ডের মূল কারন উৎঘাটন ও খুনিদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের বক্তব্য-
আব্দুল হক মিয়া খুন হওয়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন, থানার অফিসার ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন, সাতকানিয়া সর্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকারিয়া রহমান জিকু ও চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন । হত্যাকান্ডটি কেন ঘটতে পারে, কারা জড়িত এসব বিষয়াদিতে সচ্চ ধারনার জন্য বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলেছেন তারা। পরিদর্শন শেষে এসপি এস এম রশিদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ঘটনাস্থল পরির্দশন করেছি। হত্যাকান্ডের মেটিভ উদ্ধারের চেষ্টা করছি। সব দিক মাথায় নিয়েই পুলিশ ঘটনাটি দেখছে। আশা করি দ্রুততম সময়ের মধ্যে হত্যাকান্ডের কারন জান যাবে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সাতকানিয়া সর্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকারিয়া রহমান জিকু বলেন, আমি ঘটনাস্থল পরির্দশন করে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি। আপাতত মিঞা সাহেবের সাথে থাকা চিকিৎসাধীন জমির উদ্দিনকে আমরা আমাদের হেফাজতে নিয়েছি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করব। বিভিন্ন দিককে সামনে রেখে পুলিশ তদন্ত করছে। সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আনোয়ার হোসেন বলেন, পুলিশের একাধিক টিম রহস্য উম্মোচনে কাজ করছে। আমরা আশাবাদী খুনিরা গ্রেপ্তার হবেই।
জানাযা ও দাফন-
গতকাল দুপুর ১২টার সময় পুলিশ সুরতহাল রির্পোট শেষ করে ময়না তদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। ময়না তদন্ত শেষে লাশ নিজ বাড়ি আনা হবে এবং মঙ্গলবার বেলা ১১টার সময় জনার কেওচিয়া নানু পুকুর শাহি জামে মসজিদ মাঠে নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছেন আব্দুল হক মিঞার বড় ছেলে নেজাম উদ্দিন।

Share This Post

আরও পড়ুন