বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, ০১:০৭ অপরাহ্ন

ভারতে বিধানসভা নির্বাচন : বিরোধীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার

ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া
  • প্রকাশ : শনিবার, ৮ মে, ২০২১
  • ৭৫

ভারতে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মাসব্যাপী ম্যারাথন ভোটগ্রহণ শেষে ফল ঘোষণা করা হয়েছে গত ২ মে রোববার। টানটান উত্তেজনার পর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, তামিলনাড়–, কেরালা ও পদুচেরি বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই তোলপাড় শুরু হয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে। ফলাফল ঘোষণার পর কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির মধ্যে একদিকে হতাশা; অপরদিকে বিরোধী জোট ও দলগুলোর মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। কারণ এ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি যে ধরনের ফলাফল প্রত্যাশা করেছিল, তার ধারে-কাছেও নেই হিন্দুত্ববাদী এ দলটি। মোদি, অমিত শাহর আশা ছিল পশ্চিমবঙ্গে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসছে বিজেপি। পাঁচ রাজ্যের মধ্যে শুধুমাত্র আসামে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পুনরায় ক্ষমতায় এসেছে। তবে আসামে এবারের নির্বাচনে ভোট বাড়লেও বিজেপির আসন কমেছে। অপরদিকে কংগ্রেস জোটের আসন বেড়েছে। এদিকে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়– ও কেরালাÑ এ তিন রাজ্যের মধ্যে দুই রাজ্যে আঞ্চলিক দল ও একটি রাজ্যে বামফ্রন্ট বিজয়ী হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ সাল তথা এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস শতকরা ৪৮ ভাগ ভোট পেয়ে আসন পেয়েছে ২১৩টি, আর বিজেপি ৩৮ ভাগ ভোট পেয়ে আসন পেয়েছে ৭৭টি। বামফ্রন্ট কংগ্রেস ও ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের সাথে জোট করে ভোট পেয়েছে মাত্র ৬ ভাগ। কিন্তু বামফ্রন্ট কোনো আসন পায়নি। এ জোটের সেক্যুলার ফ্রন্টের একজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। কংগ্রেসও কোনো আসন পায়নি। ২১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ভোট পেয়েছিল ৪৫ ভাগ আর আসন পেয়েছিল ২১১টি। এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের ভোট ও আসন দুটিই বেড়েছে। অপরদিকে বিজেপিরও আসন ও ভোট বেড়েছে। ২০১৬ সালে বিজেপি ভোট পেয়েছিল ১০ ভাগ আর আসন পেয়েছিল মাত্র তিনটি। বামফ্রন্ট ২০১৬ সালে ভোট পেয়েছিল ২৬ শতাংশ আর আসন পেয়েছিল ৩২টি।
ভারতের প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ১৯৫১-৫২ সালে। তখন থেকে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস আর বামফ্রন্টই প্রায় ছয় দশক ধরে ক্ষমতায় ছিল। বিগত এক দশক ধরে দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আছে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস। তারপর এই প্রথম একসময়ের ক্ষমতাসীন দল বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে কোনো আসন পেল না। এবার সাবেক দুই ক্ষমতাসীন দল জোটও করেছিল কথিত আরেকটি সেক্যুলার ফ্রন্টকে নিয়ে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি এ দুই হেভিওয়েট দলের। বামফ্রন্ট ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, এবার সেটা কমে হয়েছে ৫ দশমিক ৬৭। কংগ্রেসের ভোট ৫ দশমিক ৫ থেকে কমে হয়েছে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
কংগ্রেসকে হারিয়ে ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট জোট পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। ১৯৭৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ১০টি বিধানসভার নির্বাচন হয়েছে। ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট কখনো ৪০ শতাংশের কম ভোট পায়নি। অথচ এখন তাদের ভোটের হিস্যা ৬ শতাংশের নিচে চলে গেছে।
১৯৭৭ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সাতটি নির্বাচনে বামফ্রন্ট ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় কমবেশি ২০০ আসন পেয়েছে। ১৯৮৭ সালে সর্বোচ্চ ২৫১টি পেয়েছিল। ২০১১ সালে বামফ্রন্টকে হারিয়ে তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসে। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোট ২২৬ আসন পেয়েছিল আর বামফ্রন্ট আসন পেয়েছিল মাত্র ৬২টি। ২০১১ সালে মাত্র ৬২ আসন পাওয়া দিয়ে বামদের বিপর্যয়ের শুরু। ২০১৬ সালের নির্বাচনে পেয়েছিল ৩২টি। ২০২১ সালে বামফ্রন্ট একটি আসনও পায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, কংগ্রেস ও আব্বাস সিদ্দিকির নবগঠিত দলের সঙ্গে জোট করার পরও ফলাফলের এই অবস্থা।
২০১১ সালের নির্বাচনে বিজেপি এই রাজ্যে কোনো আসন পায়নি। ভোট পেয়েছিল মাত্র ৪ শতাংশ। পরের নির্বাচনে ভোট পায় ১০ ভাগ। আর এখন তারা মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা দেখছেন ওয়াকিবহাল অনেকে। ২০১৯-এর সর্বশেষ লোকসভায় তারা ভোট পেয়েছে ৪১ ভাগ। আসন পেয়েছে রাজ্যের প্রায় অর্ধেক এবং রাজ্যে বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
আসামেও বিজেপির আসন কমেছে, বেড়েছে কংগ্রেসের আসন : আসাম রাজ্যেও ২০১১-এর চেয়ে ২০১৬-এর বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপির ভোট বেড়েছিল ৩০ ভাগ। ২০০৯-এর চেয়ে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ভোট বেড়েছে ২০ ভাগ। কিন্তু এবারের নির্বাচনে আসামে অবশ্য বিজেপি জোটের ভোট ও আসন দুটিই কমেছে। অপরদিকে কংগ্রেস ও বদরুদ্দিন আজমলের অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সমন্বয়ে গঠিত জোটের ভোট ও আসন দুই-ই বেড়েছে। এবার বিজেপি জোট পেয়েছে ৭৬ আসন, যা আগেরবারের চেয়ে তিন আসন কম। আর কংগ্রেস জোট আগের বারের চেয়ে সাত আসন বেশি পেয়ে ৪৯ আসনে বিজয়ী হয়েছে। কংগ্রেস গত ২০১৬ সালের নির্বাচনে আসন পেয়েছিল ৪২টি।
তামিলনাড়ুতেও নেই বিজেপি : ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়–তে ক্ষমতাসীন দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম (এআইএডিএমকে)-র সাথে জোট করেও বিজেপি শতকরা তিন ভাগের বেশি ভোট পায়নি। বরং বিজেপির সাথে ভোট করে ক্ষমতাসীন এআইএডিএমকে ক্ষমতা হারিয়েছে। বিরোধী দল দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) ও কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ এলায়েন্স (এসপিএ) ১৫৯ আসন পেয়ে এক দশক পর ক্ষমতায় আসছে। এমকে স্টালিনের নেতৃত্বধীন ডিএমকে শতকরা ৩৮ ভাগ ভোট পেয়ে এককভাগে ১২৫ আসনে বিজয়ী হয়েছে। ২৩৪ আসনের বিধানসভার জন্য প্রয়োজন ১১৮ আসন। ক্ষমতাসীন এআইএডিএমকে পেয়েছে মাত্র ৭৫ আসন। তামিলনাড়–র সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম করুনানিধির পুত্র এমকে স্টালিনই হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী।
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ডিএমকে ভোট পেয়েছিল ৩১ ভাগ, এবার পেয়েছে ৩৮ ভাগ। এআইএডিএমকে ২০১৬ সালে পেয়েছিল ৪১ ভাগ ভোট, এবার পেয়েছে ৩৩ ভাগ। বিজেপি ২০১৬ সালে তামিলনাড়–তে ভোট পেয়েছিল মাত্র তিন ভাগ, এবার জোট করেও পেয়েছে সেই তিন ভাগ। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে ডিএমকে পেয়েছিল ৩৩ ভাগ ভোট, কংগ্রেস ১৩ ভাগ, এআইএডিএমকে ১৯ ভাগ আর বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৪ ভাগ ভোট।
কেরালায় বিজেপির আসন শূন্য : ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার বিধানসভার ১৪০ আসনের মধ্যে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি একটি আসনও পায়নি। এ রাজ্যে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার নেতৃত্বাধীন লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) ৩৯ ভাগ ভোট পেয়ে ৯৯ আসনে জয়ী হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসছে। বিরোধী কংগ্রেসের নেতৃত্বধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) ৩৫ ভাগ ভোট পেয়ে ৪১ আসন নিয়ে বিরোধী দলেই থাকছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এলডিএফ ৪৩ ভাগ ভোট পেয়ে ৯১টি আসন আর ইইউডিএফ ৩৯ ভাগ ভোটে ৪৭টি আসন পেয়েছিল। আর বিজেপি এবারের নির্বাচনে ১১ ভাগ ভোট পেলেও একটি আসনেও বিজয়ী হতে পারেনি, ২০১৬ সালে নির্বাচনে বিজেপি ১০ ভাগ ভোট একটি আসনে জয় পেয়েছিল। অবশ্য ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ১৩ ভাগ ভোট পেয়েছিল।
কেরালায় ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের ২০টি আসনে কংগ্রেস-জোট পেয়েছিল ১৯টি; বামজোট বাকি ১টি। ওই নির্বাচনে কংগ্রেস-জোট ভোট পায় ৪৭ শতাংশ; বামরা ৩৬ শতাংশ, বিজেপি-জোট ১৬ ভাগ।
ভারতের অনেক রাজ্যে মোদি-অমিত শাহ জুটির জোয়াড় চলাকালেও কেরালায় লোকসভা ও বিধানসভায় কোনো আসন পাচ্ছে না বিজেপি। বিগত এক দশকে কেরালায় তাদের ভোট কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো আসন পায়নি। কেরালার জনগণ বিজেপিকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিচ্ছে না। কেন্দ্রে লোকসভা ও রাজ্যে বিধানসভা দুই পরিষদেই কেরালা থেকে বিজেপির কোনো প্রতিনিধি নেই।
কেরালায় হিন্দু জনসংখ্যা হচ্ছে ৫৫ ভাগ, আর অহিন্দু হচ্ছে ৪৫ ভাগ, তন্মধ্যে মুসলিম হচ্ছে ২৭ ভাগ আর খ্রিস্টান হচ্ছে ১৫ ভাগ। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিম্নবর্ণের হিন্দুর সংখ্যা বেশি। কেরালার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ানও নি¤œবর্ণের হিন্দু। শতকরা ৫৫ ভাগ হিন্দু হওয়ার পরও কেন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি বিজয়ী হওয়ার মতো ভোট পাচ্ছে না, সাধারণ জনগণের সমর্থন পাচ্ছে নাÑ এটা এক বড় প্রশ্ন। কিন্তু কেন কেরালার জনগণ ও ভোটাররা বিজেপির হিন্দুত্ববাদকে গ্রহণ করছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কেরালায় নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা বেশি। এই শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ক্ষমতাসীন কম্যুনিস্ট পার্টির প্রভাব রয়েছে। অপরদিকে ভারতে দিল্লির পরই কেরালায় শিক্ষার হার বেশি যা প্রায় ৯৬ শতাংশ। বিজেপি এ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাঝে হিন্দুত্ববাদকে গেলাতে পারছে না, যেমন করে পারছে না দিল্লি ও পাঞ্জাবের মতো শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাঝে। বিজেপি হিন্দুত্ববাদকে ভর করে ভারতের একটি অসচেতন অংশকে প্রভাবিত করতে পারলেও দিল্লি, পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গের মতো শিক্ষিত এলাকাগুলোয় ভোটারদের সমর্থন পাচ্ছে না। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকলেও দিল্লিতে ক্ষমতায় বিজেপির কট্টরবিরোধী কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি।
সারা ভারতে বিজেপি হিন্দুত্ববাদকে ধারণ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দলেই পরিণত হয়েছে। ভারতের সংখ্যালঘুদের কাছে বিজেপির কোনো আবেদন নেই। তাই কেরালার মুসলিম খ্রিস্টানসহ অহিন্দু ৪৫ ভাগের কোনো ভোটই বিজেপি পাচ্ছে না।
পঞ্চায়েত নির্বাচনেও বিজেপির শোচনীয় পরাজয় : “মোদির বারানসি, ‘রাম জন্মভূমি’ অযোধ্যার ভোটে শোচনীয় পরাজয় হলো বিজেপি-র” কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতা পরিবেশিত একটি খবরে এভাবেই শিরোনামটি করা হয়। গত ৪ মে বিকেলে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রকাশিত খবরের পুরো বিবরণ হচ্ছে, “উত্তরপ্রদেশের পঞ্চায়েত ভোটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনকেন্দ্র বারানসিতে ভরাডুবি হলো বিজেপির। পাশাপাশি ‘রাম জন্মভূমি’ অযোধ্যা এবং ‘কৃষ্ণের এলাকা’ মথুরাতেও পরাজিত পদ্ম শিবির। সামগ্রিকভাবেও যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে বিরোধীরা বিজেপি-র তুলনায় অনেক বেশি আসনে জিতেছে।
বারানসি জেলা পঞ্চায়েতের (জেলা পরিষদ) ৪০টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে মাত্র ৮টিতে। এনডিএ জোটের শরিক আপনা দল (এস) পেয়েছে ৩টি। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি পেয়েছে ১৫টি, বিএসপি ৫ এবং আম আদমি পার্টি, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি ১টি করে আসনে জিতেছে। কয়েকটি আসন গেছে নির্দলীয়দের দখলে।
অযোধ্যা জেলা পঞ্চায়েতের ৪০টি আসনের মধ্যে ২৪টি জিতেছে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি। বিজেপি-র ঝুলিতে মাত্র ৬। বিএসপি ৫ এবং নির্দল ও অন্যেরা ৫টি আসনে জিতেছে। মথুরা জেলা পঞ্চায়েতে বিএসপি ১২ এবং অজিত সিংহের রাষ্ট্রীয় লোকদল ৯টি আসনে জিতেছে। বিজেপি জিতেছে মাত্র ৩টিতে।
রোববার (২ মে) থেকে উত্তরপ্রদেশের ৭৫টি জেলায় ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ভোটের গণনা শুরু হয়েছে। জেলা পঞ্চায়েতের ৩ হাজার ৫০টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৯১৮টিতে বিজেপি জিতেছে বলে দলের তরফে দাবি করা হয়েছে।” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শিষ্য বিজেপির শীর্ষস্থানীয় নেতা যোগী আদিত্যনাথ হচ্ছে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের ক্ষমতায়ও বিজেপি। পঞ্চায়েত হচ্ছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একটি স্তর। রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভার অধীনে বেশ কয়েকটি পঞ্চায়েত থাকে। আর একটি পঞ্চায়েতের অধীনে বেশ কয়েকটি ওয়ার্ড থাকে। পাঁচ রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচনে অনেকটা ভরাডুবির পর বিজেপির ঘাঁটি বলে দাবি করা উত্তরপ্রদেশের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপির পরাজয়ের ডঙ্কা শুরু হয়েছে।
কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়–সহ বিভিন্ন রাজ্যে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে যেভাবে একটি বিজেপিবিরোধী হাওয়া তৈরি হয়েছে। এ হাওয়ায় বড় রাজ্যগুলোয় আঞ্চলিক দল ও জোটের অভাবনীয় বিজয় বিজেপি ও মোদি অমিত শাহদের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ চ্যালেঞ্জ হিসেবেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভারতের বিশিষ্ট কলামিস্ট শোভা দে তার এক কলামে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বলেছেন, আজ পশ্চিমবঙ্গে যা ঘটেছে, আগামীকাল পুরো ভারতে তা ঘটবে। মমতার নির্বাচনী কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোর বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে যা হলো, সেটা কেবল শুরু। যারা বিজেপি নামের বিপদের বিরুদ্ধে লড়তে চান, তাদের আশা জোগাবে ভোটের এ ফলাফল। ভারতের এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, ভারতের জনগণ ফ্যাসিস্ট শক্তিকে চিনতে পেরেছে, তাই তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাদেরকে ভারতের জনগণ ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করেছে। আগামী নির্বাচনগুলোয়ও ভারতের জনগণ এ ফ্যাসিস্ট শক্তিকে উৎখাত করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। তিনি বিরোধী রাজনৈতিক ঐক্যের ব্যাপারে তার অভিমত ব্যক্ত করে বলেছেন, এবারের বিধানসভার নির্বাচনের ফলাফলের প্রেক্ষিতে ভারতের বিরোধী দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ার একটি কৌশল প্রণীত হবে বলে মনে করেন। সর্বোপরি এবারের ২০২১ সালের পাঁচ রাজ্যের বিধানসভার এ নির্বাচন ও নির্বাচনে ভোটের ফলাফলের একটি লক্ষণীয় প্রভাব আগামী দিনে নির্বাচন ও রাজনীতিতে পড়বে, যা বিরোধীদের জন্য ইতিবাচক হবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যে মহারাষ্ট্র থেকে শুরু করে দিল্লি, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, বিহার, উত্তরপ্রদেশের আঞ্চলিক দল ও জোটের নেতারা যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে ফোন করে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, তাতে করে বোঝা যাচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে একটি মেরুকরণ হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে বিগত ৭০ বছর ধরে যে বহুত্ববাদের রাজনীতি ছিল, বিগত এক দশকে বিজেপি হিন্দুত্ববাদের নামে তা ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিজেপি ভারতের রাজনীতিতে একদিকে হিন্দুত্ববাদ, অপরদিকে উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী এভাবেই মেরুকরণ করছে। তাই মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ ও তফসিলী সম্প্রদায়সহ শিক্ষিত হিন্দুরা ভারতের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার স্বার্থেই বিজেপিবিরোধী একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছতে চাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। এবারের সর্বশেষ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট ও তার ফলাফল এমনই একটি মেসেজ দিচ্ছে।

Share This Post

আরও পড়ুন