শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:২৮ অপরাহ্ন

বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে বিএনপি-জাপা সাংসদের পাল্টাপাল্টি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশ : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৭৭৫

বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে সংসদে বিএনপির দুই সংসদ সদস্য যখন কড়া সমালোচনা করছিলেন তখন জাতীয় পার্টির একজন সংসদ সদস্য তাদের পাল্টা সমালোচনা করলেন।

বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ ও রুমিন ফারহানার দাবি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে মানুষকে উঠিয়ে নিয়ে হত্যা করে নাটক সাজানো হচ্ছে। আর সরকার সেগুলোর সার্টিফিকেট দিচ্ছে।

তাদের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান বলেন, ‘কেউই দায় এড়াতে পারেন না। বিএনপি সরকারের আমলে ক্লিনহার্টের নামে অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে বিচারবহির্ভূতভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। অনেকে সেই নির্যাতনে চিহ্ন নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। মিথ্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।’

সোমবার জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যক্রম শেষে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর দিয়ে হারুনুর রশীদ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তোলেন। বক্তব্যে তিনি সব মানুষ আইনের আশ্রয় লাভের সমান সুযোগ পাবেন কি না তা জানতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দাবি করেন।

হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আজ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিষয়ে যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে গত ১০/১২ বছরে তিন হাজারের বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজ যারা স্বজনকে হারিয়েছে, গুম হয়েছে বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে তারা কি আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার পাবে না? সংবিধানের এই বিধানগুলো কি আমরা স্থগিত করে দিয়েছি?’

নিজের নির্বাচনী এলাকার তিনটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ দিয়ে বিএনপির এই এমপি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর বলা হয় পুলিশের ওপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ! এটা কি সম্ভব! পুলিশের কাছে যে অস্ত্র থাকে তা মোকাবিলার জন্য সন্ত্রাসীদের কাছে যে অস্ত্র দরকার। এখানে উদ্ধার দেখানো হয় হাতে তৈরি বাটাল, পিস্তল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিচয়ে মানুষকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। উঠিয়ে নিয়ে উপর্যুপরি হত্যা করছে। আর নাটক বানাচ্ছে। সরকার সেগুলোর সার্টিফিকেট দিচ্ছে। এসব ঘটনা ঘটেই চলেছে।’

পুলিশের গুলিতে টেকনাফে মেজর (অব.) সিনহার হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনার তদন্ত চলছে। আদালতে বিচার হচ্ছে। কিন্তু তিন হাজারের অধিক হত্যাকাণ্ডে ওইসব পরিবার কি আইনের আশ্রয় লাভের সুযোগ পাবে না? তাদের পাশে রাষ্ট্র দাঁড়াবে না?’

এ সময় তিনি ‘আইনের লাভের অধিকার সব নাগরিক সমানভাবে পাবে কি না’ সেই বিষয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করেন।

২০০৩ সালে প্রণীত ‘হেফাজতে নির্যাতন ‍ও মৃত্যু নিবারণ’ আইনের প্রসঙ্গ টেনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এই আইনটিকে চমৎকার সব ধারা থাকা সত্ত্বেও দুঃখজনক হলেও সত্য এই আইনের আওতায় খুব বেশি মামলা হয়নি। যে গুটিকয়েক মামলা হয়েছে তার অগ্রগতি সম্পর্কে বেশি জানি না। একটি মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। এই দীর্ঘ সাত বছর গেল এই সময় অসংখ্য ব্যক্তি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। কিন্তু তার মামলাগুলো কী হলো? কেন পরিবার মামলা করার সাহস পায় না? কেন মামলা হয় না? হলেও সেগুলোর কী অবস্থাও তার কিছুই আমরা জানি না।’

মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘অতি সম্প্রতি একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সবার দৃষ্টি কেড়েছে। যেই দেশে প্রতিদিনই একটির বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়। বার বার বলা হচ্ছে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এর একটিও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।’

রুমিন বলেন, ‘টেকনাফে কুখ্যাত ওসি প্রদীপ ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম পেয়েছেন। এই পদক দেয়ার ক্ষেত্রে যে ছয়টি ঘটনার উল্লেখ করা হয়, তার প্রত্যেকটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পুরস্কারস্বরূপ কোনো পুলিশ অফিসার যদি সর্বোচ্চ পদক পেয়ে থাকেন তাহলে সেটা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করবে এটাই স্বাভাবিক। আর কেবল পদক নয়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পেছনে অর্থ লেনদেনের বিষয় জড়িত রয়েছে।’

জাতীয় পার্টির পীর ফজলুর রহমান আইনজীবীদের এনরোলমেন্ট পরীক্ষার প্রসঙ্গে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দিতে ফ্লোর নিলেও তার আগে তিনি বিএনপির দুই এমপির বক্তব্যের জবাব দেন।

জাপার এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে সবাই। এখানে ওসি প্রদীপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দায় কেউই এড়াতে পারেন না। ওসি প্রদীপের প্রথম পদোন্নতিটি বিএনপির আমলে হয়েছে। সেখান থেকেই শুরু হয়েছে। অপারেশন ক্লিনহার্ট বিএনপি সরকারের আমলে হয়েছিল। ওই ক্লিনহার্টের সময় অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে বিচারবহির্ভূতভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। অনেকে সেই নির্যাতনে চিহ্ন নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। মিথ্যা মামলায় আসামি করা আমরা আগেও দেখেছি। ময়মনসিংহ সিনেমা হলে বোমা বিস্ফোরণ মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী ও অধ্যক্ষ মতিউর রহমানকে আসামি করা হয়েছিল। আমরা তখনও এর বিরুদ্ধে ছিলাম। এখনো এর বিরুদ্ধে। আমরা সমস্ত অমানবিকতার বিরুদ্ধে।’

পরে তিনি করোনাকালে বার কাউন্সিল পরীক্ষা নিয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকি না বাড়িয়ে জেলা জজের অধীনে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে আইনজীবী এনরোলমেন্টের ব্যবস্থা করার দাবি করেন।

Share This Post

আরও পড়ুন