মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:২২ অপরাহ্ন

জেনে নিন আপনার যত অধিকার নামজারী খতিয়ান কেন প্রয়োজন

এ এম জিয়া হাবীব আহসান
  • প্রকাশ : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২০
  • ৮৬

অনেক শিক্ষিত,উচ্চ শিক্ষিত লোককেও বলতে শুনেছিমিউটেশান খতিয়ানকে  ভুলভাবে ইমিটেশন খতিয়ান উল্লেখকরতে এই সম্পর্কে সকলের সম্মক জ্ঞান থাকা দরকার  যদিওখতিয়ান স্বত্বের একমাত্র প্রমাণ নয়, তবুও এটা সম্পত্তিরমালিকের দখলের প্রমাণ বহন করেখরিদ সূত্রে, ওয়ারিশ সূত্রে,  দান, হেবা, এওয়াজ, লীজ, অছিয়ত ইত্যাদি যে কোন হস্তান্তরদলিল সূত্রে স্থাবর সম্পত্তি বা ভূমির (জমির) মালিকানা অর্জনকরা যায় কিন্তু  অর্জিত মালিকানায় দখলের প্রমাণ হলোখতিয়ানএজন্যে পূর্বের মালিকের স্থলে বর্তমান মালিকের নামেনামজারী করাকেই খারিজ খতিয়ান বা নামজারী (মিউটেশান) খতিয়ান বলে বর্তমানে সম্পত্তির নামজারী জমাভাগ খতিয়ানছাড়া সম্পত্তি হস্তান্তর বা বেচা-বিক্রী, বন্ধক ইত্যাদি করা যায় নাসরকার কর্তৃক ভূমি অধিগ্রহণ করলে ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষ নামজারীরঅভাবে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ লাভেও ব্যর্থ হয়ফলে নানা মামলা-মোকদ্দমা  ও বিরোধের সৃষ্টি হয়ভূমির মালিক নিজ নামেসরকারী  সেরেস্তায় ভূমি কর দিতে হলেও তার নামজারীপ্রয়োজনপৃথক নামজারী ছাড়া কোন ব্যক্তি এজমালী সম্পত্তিবন্ধক দিতে পারেন না কেন খারিজ/নামজারী/মিউটেশানকরবেনঃ যে কোন সময় জমি  বিক্রয় করা যাবে(রেজিস্ট্রেশনআইন, ১৯০৮- এর  ৫২এ ধারা এবং  সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ –এর  ৫৩সি ধারা অনুসারে, দলিল মূলে প্রাপ্ত জমিরনামজারী খতিয়ান না থাকলে সে জমি বিক্রয় করা যাবে না মিউটেশান করলে ভূমির মালিকানা হালনাগাদ হবে ভূমিউন্নয়ন কর আদায়/প্রদান করা সহজ হবে খতিয়ান হালনাগাদনা থাকার ফলে জরিপ কাজে সুবিধা হবে সরকারের খাস জমি সংরক্ষণে সুবিধা হবে নদী সিকস্তি পয়স্তি জনিত কারণে রেকর্ডসংশোধন করা হবে মূল ভূমি মালিকের মৃত্যুতেউত্তরাধিকারীগণের মালিকানার নির্দিষ্ট অংশ সম্বলিত খতিয়ানপ্রস্তুত হবে রেজিস্ট্রীকৃত দলিল মূলে জমি হস্তান্তরের  কারণে ক্রেতা বা  গ্রহীতার নামে খতিয়ান প্রস্তুত হবে মামলা-মোকদ্দমাথেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বিক্রেতা আপনার ক্রয়কৃত জমিদ্বিতীয়বার বিক্রয় করতে পারবে না সর্বোপরি যে কোন বিতর্কেরসময় মালিকানা বা দখল প্রমাণের ক্ষেত্রে নামজারী সংক্রান্তকাগজপত্রাদি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বা প্রমাণ কাগজ হিসাবে বিবেচিতহবে নামজারী তিন ভাবে হয়ে থাকেঃ ক) শুধু নামজারী বানামপত্তন কোন রেকর্ডীয় মালিকের নামের পরিবর্তে একইখতিয়ানে পরবর্তী গ্রহীতাওয়ারিশগণের  নামভূক্ত হলে  তাশুধু নামজারী বা নামপত্তন হিসাবে পরিচিতরাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণপ্রজাস্বত্ব আইনের ১৪০ ধারা মতেধরণের নামজারী বানামপত্তন হয়ে থাকে খ) নামপত্তনজমা খারিজ কোনদাগের জমি বিক্রয় বা অন্য কোন প্রকার হস্তান্তরের মাধ্যমেবিভক্ত হলে  এবং এই বিভক্তির জন্য পৃথক  হিসাব বা হোল্ডিংখুলে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের  আদেশ দিলে তা নামপত্তন জমা খারিজ নামে পরিচিত । এ ক্ষেত্রে জমির মালিকানারপরিবর্তন হবে  এবং পৃথক খতিয়ান এবং হোল্ডিং নম্বর পড়বে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণপ্রজাস্বত্ব আইনের  ১৪৩ ও ১১৭ ধারা  মতেনামপত্তনজমা খারিজ প্রক্রিয়া  পরিচালিত  হয়ে থাকে গ)নামপত্তনজমাখারিজ একত্রীকরণঃকোন ব্যক্তির একইমৌজার ভিন্ন ভিন্ন খতিয়ানে জমি থাকলে, এই  খতিয়ানগুলোর মাধ্যমে প্রাপ্ত জমি একই খতিয়ানে অন্তর্ভূক্ত করে নতুন খতিয়ানপ্রস্তুত করলে, তাকে নামপত্তনজমা একত্রীকরণ করা  বলা হয়রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণপ্রজাস্বত্ব আইনের  ১৪৩ ও ১১৬ ধারাঅনুসারেপ্রক্রিয়া সম্পাদিত হয় নামজারীর সময়সীমামহানগরের ক্ষেত্রে ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) কর্মদিবস এবং অন্যান্যক্ষেত্রে ৩০(ত্রিশ) কর্মদিবস সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবরআবেদন দাখিল । (ভূমি অফিসের নির্ধারিত ফরমে অথবাwww.minland.gov.bd এই ওয়েবসাইট  থেকে বিনা মূল্যে  ফরমডাউনলোড করে ব্যবহার  করা যায় অর্থাসরাসরি অনলাইনেআবেদন দাখিল করা যায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃকপ্রাথমিক যাচাই বাছাই শেষে সরেজমিন তদন্তের জন্য আবেদনটিসংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রেরণ করা হয় ইউনিয়ন ভূমিঅফিস কর্তৃক প্রস্তাব/প্রতিবেদন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে প্রেরণ করা হয় তারপর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক  সংশ্লিষ্ট পক্ষগণকে  শুনানীর জন্য নোটিশ প্রদান করা হয়নোটিশ প্রাপ্তির পর যাবতীয় মূল কাগজপত্রসহ  আবেদনকারীকর্তৃক শুনানীতে অংশগ্রহণ করতে হয় পরিশেষে কানুনগোকর্তৃক প্রতিবেদন এবং নথিপত্র যাচাই করত সহকারী কমিশনার(ভূমি) কর্তৃক আদেশ প্রদান পূর্বক নামজারী জমাভাগ খতিয়ানসৃজন করা হয় নামজারীর ফিসআবেদনপত্রের সঙ্গেকাগজপত্র খারিজ/মিউটেশান/ নামজারীর জন্য নিম্নলিখিত হারেফিস প্রদান করতে হবেআবেদনের সঙ্গে কোর্ট ফি ২০/-(বিশ) টাকা, নোটিশ জারী ফি ৫০/-(পঞ্চাশ) টাকা, রেকর্ড সংশোধন বাহালকরণ ফি ১,০০০/-(এক হাজার) টাকা, প্রতি কপি মিউটেশানখতিয়ান সরবরাহ বাবদ ১০০/-(একশত) টাকা ফি নির্ধারিতআছে উল্লেখ্য,  আবেদনপত্রের কোর্ট ফি  ছাড়া বাকিগুলোডিসিআরের মাধ্যমে আদায় করা হয়, তাই বাকি ১,১৫০/- টাকাঅফিসে নগদে ফিস জমা দিয়ে ডিসিআর সংগ্রহ করতে হয়ডিসি আর মানে খতিয়ানের টোকেন বা ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিটএটাও একটা গুরত্বপূর্ণ ডুকুমেন্ট যা হারালে আর নকলের কপিপাওয়া যায় নানামজারীর আবেদনে যে সব কাগজপত্রলাগবেঃ ) ২০/-(বিশ) টাকার কোর্ট ফি সহ মূল আবেদন ফরম ) আবেদনকারীর  ১(এক) কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি(একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রত্যেকের জন্য ছবি প্রয়োজন ) আবেদনকারীর পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি (জাতীয়পরিচয়পত্র/ ভোটার আইডি/জন্ম নিবন্ধন সনদ/পাসপোর্ট/ড্রাইভিং লাইসেন্স/ ইত্যাদি ) খতিয়ানের ফটোকপি/সার্টিফাইডকপি । ৫) বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রশিদ ) সর্বশেষ জরিপের পর থেকে বায়া দলিলের সার্টিফাইড কপি বাফটোকপি । ৭) উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা লাভ করলে অনাধিক তিন মাসের মধ্যে ইস্যুকৃত মূল উত্তরাধিকারী সনদ । ৮)ডিক্রীর মাধ্যমে জমির মালিকানা লাভ করলে ডিক্রীর সার্টিফাইড কপি বা ফটোকপি জমা দিতে হবে তবে শুনানীগ্রহণকালে দাখিলকৃত কাগজের মূলকপি অবশ্যই আনতে হবেএবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দখল/প্রয়োজনীয়  মালিকানার রেকর্ডপত্র দেখাতে হবে কেননা খতিয়ানভুল লিপি হলে তার বিজ্ঞ দেওয়ানি আদালতে ঘোষণা মোকাদ্দমাকরে তা সংশোধনী রায় ডিক্রি নিয়ে তার সরকারের ভূমিঅফিসে দাখিল করতে হয় বর্তমানে এজমালী  মৌরশী সম্পত্তিবিভাগবন্টন  দলিল ছাড়া পৃথক মিউটেশান করা যায় না । এ ব্যাপারে উত্ত্রাধকারীদের খতিয়ান সংশোধনের ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ এর প্রজাস্বত্ব আইনে ১৪৩ (খ) সংযোজন করে গত ৭ই জুলাই ২০১৯ ইং সাল বাংলাদেশ সরকারগেজেট প্রকাশ করা যায়নি।উক্ত ধারারটি উপধারায় উল্লেখকরা হয়যথাক্রমে (১) কোন ব্যাক্তি যিনি তাহার বংশধরবলিয়া পরিচয় দেন সেই ব্যক্তির মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রেপ্রাপ্ত সম্পত্তি আপোষমুলক ভাবে বিভাজন ব্যক্তির আইন ধারাবাটোয়ারা কার্যকরী হইবেএই রূপ বাটোয়ারার পর একটিবাটোয়ারা দলীল প্রস্তুত করিতে হইবে এবং ১৯০৮ সনেররেজিস্ট্রেশন আইনে রেজিষ্ট্রি করিতে হইবে ।(২) এইরুপ বাটোয়ারাচুক্তি প্রস্তুত এবং রেজিস্ট্রেশনের পর রাজশ্ব অফিসার খতিয়ানসংশোধন করবেনসুতরাং কোন ব্যক্তি কোন জমির মালিকানালাভ করার পর তার নাম সংশ্লিষ্ট খতিয়ানে অন্তর্ভূক্ত করা বাতার নিজ নামে নতুন খতিয়ান খোলার  যে কার্যক্রম তাকেখারিজ/নামজারী বা মিউটেশান বলে সাধারণত  দীর্ঘ সময়েরব্যবধানে জরিপের মাধ্যমে  রেকর্ড সংশোধন প্রক্রিয়া পরিচালিতহয় ফলে দুই জরিপের মধ্যবর্তী সময়ে উত্তরাধিকারের  মাধ্যমেজমি প্রাপ্তির ফলে কিংবা দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের ফলেভূমির মালিকানার পরিবর্তনে খতিয়ান হালনাগাদকরণঅবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে এক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার (ভূমি) খারিজ/নামজারী বা মিউটেশনের মাধ্যমে খতিয়ান হালকরণেরকাজ করে থাকে।আশা রাখি এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় খতিয়ানসৃজন সংক্রান্ত বিষয়ে সম্যক ধরনা লাভে সহযোগী  

লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সুশাসনমানবাধিকার কর্মী

Share This Post

আরও পড়ুন